মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। পশ্চিম এশিয়ার আকাশে ঘন হচ্ছে যুদ্ধের আশঙ্কার মেঘ। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতের উত্তেজনা বাড়তে থাকায় অভ্যন্তরীণ সামরিক প্রস্তুতি জোরদার করতে শুরু করেছে তেহরান।
যুদ্ধ আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে, এমন আশঙ্কায় সশস্ত্র বাহিনীকে সর্বোচ্চ সামরিক প্রস্তুতির বিশেষ প্রোটোকল ‘কোড ১০০’ এর আওতায় এনেছে ইরান।
সম্প্রতি সূত্রের বরাতে এক প্রতিবেদনে এমনটাই জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস। তবে ইরানের সরকারি গণমাধ্যম এ খবরের কোনো সত্যতা স্বীকার করেনি। তেহরানের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর, ইরানি সেনাবাহিনীর অন্যতম শাখা আরতেশ, বিমান প্রতিরক্ষাবাহিনী ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাবাহিনীকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছে ইরান সরকার।
দেশজুড়ে ‘কোড ১০০’ নামের একটি প্রোটোকল জারি করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্ভাব্য বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের আগে দ্রুত অভিযান পরিচালনার জন্য একে চূড়ান্ত প্রস্তুতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইরান তার সর্বোচ্চ জাতীয় সামরিক সতর্কতা প্রোটোকল ‘কোড ১০০’ সক্রিয় করেছে বলে খবর প্রকাশের পর পশ্চিম এশিয়াজুড়ে উত্তেজনা গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে মনে হচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সতর্কতা জারির পর সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের আগে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর সব শাখাকে সর্বোচ্চ অভিযানিক প্রস্তুতিতে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আইআরজিসি, নিয়মিত সেনাবাহিনী বা আরতেশ, বিমান প্রতিরক্ষা কমান্ড এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনী।
গত সপ্তাহে ঘটে যাওয়া একাধিক ঘটনার পর এই আকস্মিক সতর্কতা জারি করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতি বাহিনীর সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে বড় ধরনের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা।
এর জবাবে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর অঞ্চলজুড়ে জরুরি নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করেছে। মার্কিন নাগরিকদের আকস্মিক উত্তেজনা বৃদ্ধি, বাণিজ্যিক ফ্লাইট বাতিল এবং সম্ভাব্য আঞ্চলিক আকাশপথ বন্ধের জন্য প্রস্তুত থাকতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
পরিস্থিতির গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কোনো ঘোষণা ছাড়াই জাতীয় নিরাপত্তা ব্রিফিংয়ের জন্য ক্যাম্প ডেভিডে তার অবস্থান সংক্ষিপ্ত করে হোয়াইট হাউসে ফিরে আসেন।
ইরানের সরকারি গণমাধ্যম ‘কোড ১০০’ পরিভাষাটি নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু না বললেও বিশেষজ্ঞ ও উন্মুক্ত গোয়েন্দা তথ্যভিত্তিক নেটওয়ার্কগুলোর দাবি, ইরানের অভ্যন্তরে সামরিক তৎপরতা এমন একটি শক্তি বিন্যাসের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা সাধারণত সম্ভাব্য সরাসরি সংঘাতের আগে নেওয়া হয়।
ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সামরিক কাঠামোয় ‘কোড ১০০’ জরুরি প্রতিরক্ষা প্রস্তুতির সর্বোচ্চ স্তরকে বোঝায়। পশ্চিমা সামরিক ধারণার ‘ডিইএফকন ১’ বা পূর্ণাঙ্গ সৈন্য সমাবেশের সঙ্গে এর অনেকটা তুলনা করা হয়।
এই প্রোটোকলের উদ্দেশ্য হলো দেশের পুরো প্রতিরক্ষা কাঠামোকে প্রতিরোধমূলক অবস্থা থেকে তাৎক্ষণিক যুদ্ধকালীন প্রস্তুতিতে নিয়ে যাওয়া।
সামরিক কমান্ডের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ‘কোড ১০০’ ঘোষণা বা কার্যকর হলে ইরানের দ্বিস্তরীয় সামরিক ব্যবস্থায় বেশ কিছু উচ্চ অগ্রাধিকার নির্দেশনা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হয়।
শত্রুপক্ষের বিমান হামলায় আগেই ধ্বংস হওয়া এড়াতে ইরানের ‘ক্ষেপণাস্ত্র শহর’ নামে পরিচিত ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি এবং আইআরজিসির মহাকাশ বাহিনীর পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ উৎক্ষেপক ইউনিটগুলো দ্বিতীয় পর্যায়ের উৎক্ষেপণ অবস্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়।
রাশিয়ার সরবরাহ করা এস-৩০০ ব্যবস্থার পাশাপাশি দেশীয়ভাবে উৎপাদিত খোরদাদ ১৫ ও বাভার ৩৭৩ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যাটারিসহ সমন্বিত বিমান প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্কগুলো সীমান্ত অঞ্চল এবং কৌশলগত অবকাঠামোগুলোর চারপাশে উচ্চমাত্রার ট্র্যাকিং মোডে চলে যায়।
ইরানি সামরিক মতবাদ অনুযায়ী, সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে ‘মোসাইক ডিফেন্স’ প্রোটোকলও সক্রিয় হয়। শত্রুপক্ষের ইলেকট্রনিক যুদ্ধ বা সুনির্দিষ্ট হামলায় তেহরানের কেন্দ্রীয় কমান্ডের যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত বা ধ্বংস হলে আঞ্চলিক আইআরজিসি কমান্ডারদের অসম যুদ্ধ পরিচালনা ও পাল্টা হামলা চালানোর স্বায়ত্তশাসিত ক্ষমতা দেওয়া হয়।